ঢাকা, মে ১৯, ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, স্থানীয় সময়: ১৭:২৭:৩৬

এ পাতার অন্যান্য সংবাদ

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় হাইকোর্টের রায় আগামীকাল সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার কোন ষড়যন্ত্র সফল হতে দেওয়া হবে না : ধর্ম উপদেষ্টা ভারতের উচিত বাংলাদেশের উদ্বেগ নিরসন করা : তৌহিদ রোমে ‘পোপ ফ্রান্সিস ইউনূস ত্রি-জিরো ক্লাব’ উদ্বোধন সরকার পতনের ৪ দিন আগে বসুন্ধরা গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা আইয়ুব, এরশাদ, হাসিনার বিরুদ্ধে মুখে মুখে ফিরেছে যেসব স্লোগান দক্ষ নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য যথোপযোগী আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাত বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা উন্মোচনে সহায়তা করতে পারে : মার্কিন দূতাবাস মাজারে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার

অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় নতুন অন্তর্ভুক্তি নয় প্রধানমন্ত্রী

| ৯ ভাদ্র ১৪২২ | Monday, August 24, 2015

অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তালিকায় নতুন করে আরো ছয় হাজার একর জমি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব নাকচ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৪৫টি জেলার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠালে তিনি তা বাতিল করে দেন। তবে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার সময়সীমা বাড়ানো, বিভাগীয় শহরে আপিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপন, আপিল করার জন্য নতুন করে সময় দেওয়াসহ আরো কিছু বিষয়ে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংশোধনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন তিনি। এ অবস্থায় আজ সোমবার মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংশোধনের প্রস্তাব উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এর আগে ছয়বার আইনটি সংশোধন করা হয়। গত নভেম্বর মাসে আরো এক দফা সংশোধনীর প্রস্তাব পাঠানো হলে মন্ত্রিসভা বিরক্ত হয়ে সংশোধন না করেই ভূমি মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। বারবার সংশোধন না করে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া পুনর্গঠন করে পুনরায় মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয় ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়ন জাতীয় নাগরিক সমন্বয় সেলের সঙ্গে বৈঠক করে আইন সংশোধনীর খসড়া তৈরি করে ভূমি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলে আরো ছয় হাজার একর সম্পত্তি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সমন্বয় সেল। এ অবস্থায় আইনের খসড়া তৈরির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ীই সংশোধনের জন্য খসড়া আইন তৈরি করা হয়েছে।  ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অর্পিত সম্পত্তির আটটি বিষয় সংশোধন করা দরকার। এসবের মধ্যে সাতটি বিষয়ের সংশোধনী সম্পর্কে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়ন জাতীয় নাগরিক সমন্বয় সেল একমত পোষণ করে। কিন্তু ‘ক’ তফসিলের জন্য নতুনভাবে সময়সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সমন্বয় সেলের নেতাদের অবহিত করেন যে লিজ দেওয়া সম্পত্তি ‘ক’ তালিকায় না এলে তার উত্তরাধিকার বা স্বার্থাধিকারীরা কখনো এই সম্পত্তির মালিকানা পাবে না। এ-জাতীয় সম্পত্তি লিজকৃত সম্পত্তি হওয়ায় কোনো ব্যক্তি দাবি করে তার নামজারি করতে পারবে না। এতে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। শেষবারের মতো জনস্বার্থে অন্তত আরো একবার অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলের বাদ পড়া বা সংশোধনী তালিকা প্রকাশের জন্য সময় বাড়ানো প্রয়োজন বলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সমন্বয় সেলের নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। তার পরও সমন্বয় সেলের প্রতিনিধিরা তাঁদের অবস্থানে অনড় থাকেন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চাওয়া হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, যারা অর্পিত সম্পত্তির ভুক্তভোগী তারাই যদি যথাযথ সংশোধন না চায়, তাহলে অন্যদের কিছুই করার থাকে না। তবে অর্পিত সম্পত্তি হওয়ার পর ‘ক’ তালিকায় এসব সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত না করলে ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা অর্পিত সম্পত্তির তালিকা প্রকাশের সর্বশেষ সময় ছিল ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে এই চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে এক লাখ ৯৭ হাজার একর জমির গেজেট প্রকাশ করে বলা হয়েছিল অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলের এটাই চূড়ান্ত তালিকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে এসব সম্পত্তি ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও বিভিন্ন জেলা থেকে সরকারের দখলে থাকা অর্পিত সম্পত্তির নতুন নতুন হিসাব পাঠান জেলা প্রশাসকরা, যেগুলো অর্পিত সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও তালিকাভুক্ত বা গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রায় দুই হাজার একর জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন সিরাজগঞ্জের ডিসি। এ ছাড়া গাজীপুর জেলার ৪০ একর, বরিশাল জেলার ২০০ একর, মানিকগঞ্জ জেলার ৩০০ একর, চট্টগ্রাম জেলার ৬৪ একর জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য চিঠি দিয়েছেন ওই সব জেলার ডিসিরা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এটাই শেষ হিসাব নয়, ঢাকা জেলা থেকে জানানো হয়েছে তাদের কাছেও এমন সম্পত্তি আছে, যা তালিকাভুক্ত হয়নি। ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির তফসিলভুক্ত না হলে খাসজমি বা অন্যান্য সরকারি সম্পত্তি যেভাবে পরিচালিত হয় সেগুলোও একই নিয়মে পরিচালিত হবে। অর্পিত সম্পত্তির বিষয়টি জটিল এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। সরকার বিষয়টির একটি সম্মানজনক সমাধান চায়। অর্পিত সম্পত্তি আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যাদের ভুলে অর্পিত সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবে ভূমি মন্ত্রণালয় বারবার ভুল করার কথা স্বীকার করলেও কোনো জায়গায় দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় বিচারের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ হচ্ছে এসব ঘটনার সঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও জড়িত। ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি অফিসের কর্মচারীদের বিচার করতে হলে উপজেলা ও জেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও বিচার করতে হবে। এখানে আরো অনেক বিষয় জড়িত। অর্পিত সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু আমলারা ধাপে ধাপে এ উদ্যোগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এর আগে আইনটির ষষ্ঠ দফা সংশোধনীর জন্য কেবিনেটে নেওয়া হলে মন্ত্রীরা রেগে গিয়েছিলেন। অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে তাঁরা নিজ নিজ এলাকার সংকটগুলো প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। এর পরই মন্ত্রিসভা আইনটি পুনরায় সংশোধন না করে ফেরত পাঠায়। যেসব সংশোধনী আসছে : ট্রাইব্যুনাল ও জেলা পর্যায়ে আপিল করার পরও বিভাগীয় পর্যায়ে আবার আপিল করা যাবে। এ ধরনের বিধান মূল আইনে থাকলেও পরে সংশোধনীতে তা বাদ দেওয়া হয়েছিল। নতুন খসড়া সংশোধনীতে বিভাগীয় পর্যায়ে আপিল পুনর্বহালের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার সময় ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পার হয়ে গেছে। কিন্তু অনেকেই ওই সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারেনি। ভূমি মন্ত্রণালয় ট্রাইব্যুনালে আবেদনের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী অর্পিত সম্পত্তির ‘খ’ তফসিল বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ওই সম্পত্তির বিষয়ে কী করা হবে সে বিষয়ে আইনে কিছু উল্লেখ নেই। এ কারণে ‘খ’ তফসিলভুক্ত সম্পত্তির রেকর্ড হালনাগাদকরণে অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। এই অস্পষ্টতা দূর করার জন্য বাতিল করা ‘খ’ তফসিলভুক্ত সম্পত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ থাকলে তা সংশোধনের আইনগত বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ‘খ’ তফসিলভুক্ত সম্পত্তির কোনো মালিক না পাওয়া গেলে কিংবা দাবি প্রমাণিত না হলে ওই সম্পত্তি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া সংশোধিত খসড়া আইনে সরকারের সংজ্ঞা ও কয়েকটি ধারা প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। অর্পিত সম্পত্তি আইন প্রতিরোধ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন বাস্তবায়ন জাতীয় নাগরিক সমন্বয় সেলের সদস্য সুব্রত চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, “নতুন করে গেজেট প্রকাশ করা হলে আমরা আন্দোলনে যাব। কারণ আবার গেজেট করে ‘ক’ তালিকা প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্টরা নতুন করে হয়রানির শিকার হবেন। আর ‘খ’ তফসিলের বিষয়েও আমাদের আপত্তি আছে। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে এটা সংশ্লিষ্টদের নামে নামজারি করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু প্রশাসন এসব আইন পাত্তাই দিচ্ছে না। এসি ল্যান্ড অফিস থেকে কারো নামে নামজারি করে দেওয়া হচ্ছে না।” ভূমিসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, “অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য কিন্তু তালিকাভুক্ত হয়নি- এ ধরনের তালিকা গেজেটে প্রকাশের সময়সীমা বাড়ানো দরকার। আমরা বিষয়টি একবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে তুলেছিলাম। আবারও সেখানে নেওয়া হবে, তবে ভিন্ন ফরম্যাটে।” ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস, ১৯৬৫’ অনুসারে ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব নাগরিক পাকিস্তান ছেড়ে ভারত চলে যায় তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে এ সম্পত্তির নাম রাখা হয় অর্পিত সম্পত্তি। সেসব সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যপর্ণ আইন করা হয় ২০০১ সালে। সেই আইনটিই দফায় দফায় সংশোধন করা হচ্ছে।