ঢাকা, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫, স্থানীয় সময়: ১৪:১০:৪৯

হলি আর্টিজানে হামলা মামলায় বাদীর সাক্ষ্য সমাপ্ত

আইন ও মানবাধিকার | ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৫ | Tuesday, December 4, 2018

 

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা মামলায় বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর পরবর্তী সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমানের আদালতে এ বাদীর অবশিষ্ট সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে গতকাল সোমবার প্রথম দিনের মতো মামলার বাদী এসআই (উপপরিদর্শক) রিপন কুমার দাস সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্য শেষ না হওয়ায় বিচারক আজ মঙ্গলবার ফের সাক্ষ্যের জন্য দিন নির্ধারণ করেন।

আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আজ আসামিদের পক্ষে বাদীকে জেরা করা হয়।’

ফারুক বলেন, ‘আদালতে বাদীর উপস্থাপন করা আলামত সঠিক নয় হয় বলে জেরা করা হয়। এ ছাড়া এ মামলায় আসামিরা জড়িত নয় বলে জেরায় আনা হয়।’

নথি থেকে জানা যায়, বাদী রিপন কুমার দাস সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে বেশকিছু সময় গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীদের নিক্ষিপ্ত গুলি ও গ্রেনেডের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারাত্মক জখম হয়। এরপর আরো পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে আর্টিজান রেস্টুরেন্টে অবস্থানকারী সন্ত্রাসীদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে, গ্রেপ্তার ও জিম্মি থাকা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের উদ্ধারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মোতাবেক অগ্রসর হলে তারা পুলিশদের লক্ষ্য করে অনবরত গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পুলিশ জান-মাল রক্ষার্থে ও জিম্মিদের উদ্ধারের লক্ষ্যে গুলিবর্ষণ করে। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে সন্ত্রাসীরা হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের পশ্চিম দিকে ৭৯ নং রোডের ২০ নং বাড়ির সামনে অবস্থানরত অফিসার এবং ফোর্সকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে। এতে ৩০-৩৫ জন পুলিশ অফিসার ও ফোর্সকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণে ৩০-৩৫ জন মারাত্মকভাবে জখম হয়। চিকিৎসার জন্য তাদের ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন আহম্মেদ খান ও ডিবি পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার রবিউল ইসলাম মারা যান।’

বাদী বলেন, ‘পরের দিন (২ জুলাই) সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জিম্মিদের উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করে। সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করলে সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে। সেখান থেকে ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। জিম্মি থাকা অবস্থায় ২০ জনকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। অভিযানে ছয় সন্ত্রাসী নিহত হয়।’ সাক্ষ্যে তিনি আরো বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের সংহতি, জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্যাদি ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ১৭ জন বিদেশিসহ ২০ জনকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় নৃসংশভাবে হত্যা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত দুজন পুলিশ অফিসারকে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে হত্যা করে বহু সংখ্যক পুলিশ অফিসার/ফোর্স ও সাধারণ জনগণকে মারাত্মকভাবে জখম করে।

জবানবন্দি শেষে বাদী জব্দকৃত ২৫ প্রকার আলামত বিচারকের সামনে উপস্থাপিত করেন। আলামতগুলো হলো- হামলায় ব্যবহৃত তিনটি দশমিক ২২ বোরের মেশিনগান, পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, সাতটি মেশিনগানের ম্যাগজিন, পিস্তলের ছয়টি ম্যাগজিন, পিস্তলের ৩৪ রাউন্ড তাজা গুলি, মেশিনগানের ৭৯ রাউন্ড তাজা গুলি, ৯টি গ্রেনেডের সেফটি পিন, তিন শতাধিক গুলির খোসা, দুটি চাপাতি, দুটি ছোরা ।

এদিকে আজ এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ উপলক্ষে কারাগারে থাকা ছয় জঙ্গিকে হাজির করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন- জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র‌্যাশ, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ও হাদিসুর রহমান সাগর।

গত ২৬ নভেম্বর আলোচিত মামলাটির বিচার শুরুর নির্দেশ দেন একই আদালত।

গত ২৩ জুলাই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর গুলশান হামলা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়। পরে অবশ্য হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস।

এ মামলায় অভিযোগপত্রে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন আসামি বিভিন্ন অভিযানে ও পাঁচজন হলি আর্টিজানে অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া জীবিত আটজনের মধ্যে ছয়জন কারাগারে এবং বাকি দুজন পলাতক। পলাতক দুই আসামি হলেন শহীদুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।

অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গি হলেন রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

এ ছাড়া বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানে নিহত আটজন হলেন—তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। হামলার পর রাতেই তারা ২০ জনকে হত্যা করে।

সেদিনই উদ্ধার অভিযানের সময় বন্দুকধারীদের বোমার আঘাতে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরের দিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজনের মৃত্যু হয়।

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির মুখপাত্র ‘আমাক’ হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে বলে জানায় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’।

এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। মামলার পর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে দুই দফা রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে, এ মামলায় কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে আটক রাকিবুল হাসান রিগ্যানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি এ মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।