ঢাকা, নভেম্বর ২৪, ২০১৭, ১০ অগ্রহায়ন ১৪২৪, স্থানীয় সময়: ১৯:০৭:৩৬

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে কাল

দেশের খবর | ২৭ ভাদ্র ১৪২৪ | Monday, September 11, 2017

 

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে আগামীকাল আলোচনা করবেন সংসদ সদস্যরা।

বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ আজ সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামীকাল আমরা জাতীয় সংসদে এ রায় নিয়ে আলোচনা করব। এ রায়ে আমরা ক্ষুব্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিচারক অপসারণের পদ্ধতিগুলো আমরা জাতীয় সংসদে তুলে ধরব। দেশবাসীকে আমরা জাতীয় সংদের মাধ্যমে এ বিষয়ে অবহিত করব।’

গত ১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে পুনরায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে আনা হয়।

রায় ঘোষণার পরই সরকারের মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখান। প্রধানমন্ত্রীও এ রায়ের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে মন্ত্রিসভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে যা আছে 
রায়ে বলা হয়, একজন সংসদ সদস্য যদি দরকষাকষির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বা সন্দেহ হয় যে তিনি দরকষাকষির সঙ্গে যুক্ত তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান সংবিধানে নেই। এ অবস্থায় তাঁরা (সংসদ সদস্য) উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা কীভাবে নিতে চান এমন প্রশ্ন করা হয়েছে রায়ে।

৭০ অনুচ্ছেদ থাকার কারণে দলীয় নির্দেশনার বাইরে একজন সংসদ সদস্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না এমনটি উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, সেখানে বিচারক অপসারণের বিষয়ে তাঁরা কীভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে মত দেবেন। সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ।

রায়ে বলা হয়, বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ সংসদ সদস্যদের একটি দলের হাতে। এ ব্যবস্থায় দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা নেই কোনো সংসদ সদস্যের। এমনকি তাঁর দল যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেয়, তাহলেও তার বিরুদ্ধে ভোট বা মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁরা দলের নীতিনির্ধারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন। ৭০ অনুচ্ছেদ বলবৎ থাকাবস্থায় বিচারক অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে গেলে একজন বিচারককে দলীয় নীতিনির্ধারকের করুণা অনুযায়ী চলতে হবে। এ অভিমত দিতে আমরা কোনো ভুল দেখি না।

রায়ে বলা হয়, ‘অধিকাংশ সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের নজির (রেকর্ড) এবং দেওয়ানি মামলাও রয়েছে। ১৬তম সংশোধনীর দ্বারা তাঁরাই কার্যত উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রক (বস) হিসেবে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই ব্যবসায়ী। এই সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নের সময় অধিকাংশ দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকেন। তাঁদের করা আইন নিম্নমানের ও ক্রটিপূর্ণ। তাঁরাই সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবেন।’

সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব নয় একজন বিচারকের অসদাচরণ ও অযোগ্যতার বিচার করা। সংসদ সদস্যদের নিয়ে হাইকোর্টের এমন মন্তব্যের বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেন, ‘এসব অভিমত অপ্রত্যাশিত। এটা আমরা গ্রহণ করতে পারি না। আদালত সংসদ সদস্যদের নিয়ে এ জাতীয় মন্তব্য করতে পারে না।’

‘জাতীয় সংসদ ও আদালতের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক থাকা উচিত বলে মনে করেন সর্বোচ্চ আদালত। একইভাবে আদালতের কার্যক্রম নিয়ে সংসদেরও সম্পর্ক নষ্ট হয় এমন কোনো মন্তব্য করা উচিত নয়। সংসদ ও বিচার বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করা উচিত।’

রায়ে বলা হয়, ‘৭ অনুচ্ছেদ সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করেছে। এতে সুপ্রিম কোর্ট শুধুই রাষ্ট্রের একটি স্বাধীন অঙ্গ নয়, সংবিধানের অভিভাবকও বটে। সংবিধানই কোনো আইনকে সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণার এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টকে দিয়েছে।’

রায়ে বলা হয়, ‘বিচারক অপসারণ ক্ষমতা যদি সংসদ সদস্যদের হাতে যায় তবে তার প্রভাব বিচার বিভাগে পড়বে-এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ছাড়া দীর্ঘদিন সুপ্রিম জুডিশিয়াল ব্যবস্থা না থাকায় প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় কেউ কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারবে না যে আমাদের আদালতে একজন বিচারপতি কারনান (ভারতের বিচারপতি) নেই। যদি কোনো বিচারক তাঁর বিভাগের প্রধানের প্রতি দায়বদ্ধ না থাকে তবে ওই বিভাগ অকার্যকর হয়ে পড়তে বাধ্য। এ কারণে হাইকোর্ট যথাযথভাবেই এই সংশোধনীকে (১৬তম) সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করেছে। এ সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে অন্য কোনো অভিমত দেওয়ার কারণ খুঁজে পাই না।’
রায়ে আরো বলা হয়, ‘উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতের শৃঙ্খলার বিষয়ে দেশে কোনো বিধান নেই যা বিচার বিভাগের জন্য আত্মঘাতী। এ ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের অভিমত হলো নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষই ব্যবস্থা নিতে পারবে। দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ জাতীয় মন্তব্য আদালত প্রত্যাশা করেনি। তাঁর এ যুক্তি নির্বাহী বিভাগের বক্তব্যের প্রতিফলন।’

রায়ে বলা হয়, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, দেশে বর্তমানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা বলবৎ নেই। এ অবস্থায় ১৬তম সংশোধনী বাতিল হলে একটি শূন্যতার সৃষ্টি হবে। তাঁর এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বর্তমান ব্যবস্থা বাতিল হলে আগের ব্যবস্থা অর্থাৎ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা দ্রুত বলবৎ হবে। এখানে শূন্যতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই।’

সুপ্রিম কোর্ট বলছেন, ‘সংবিধানে সংসদের ক্ষমতা নির্ধারণ করা আছে। কোনো ধরনের আইন প্রণয়ন করতে পারবে তা বলা আছে। তারা যেটা সরাসরি করতে পারে না সেটা পরোক্ষভাবেও করতে পারে না।’