ঢাকা, মার্চ ২৬, ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৫, স্থানীয় সময়: ১৮:৩৭:২৩

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জার্মান সাংবাদিকের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ১১

আইন ও মানবাধিকার | ১২ ফাল্গুন ১৪২৫ | Sunday, February 24, 2019

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের হামলার শিকার জার্মান সাংবাদিক ও অন্যরা।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত বৃহস্পতিবার তিন জার্মান সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে।

জার্মান সাংবাদিকদের সঙ্গে থাকা বাংলাদেশি দোভাষী আহত মো. সিহাব উদ্দিন বাদী হয়ে চারশ থেকে পাঁচশ অজ্ঞাতনামা রোহিঙ্গাকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন। পুলিশ রাতব্যাপী অভিযান চালিয়ে কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ১১ জনকে আটক করেছে। এছাড়াও বিদেশি সাংবাদিকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ক্যামেরা, পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ মালামালগুলো উদ্ধার করেছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের জার্মান সাংবাদিকদের ওপর হামলা ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের কথা স্বীকার করে বলেন, বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে পুলিশ কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ১১ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে আটক করেছে। আটককৃতরা হলেন- লম্বাশিয়া ক্যাম্পের শাহজাহান (২৫), মোছা খলিল (৩০), নূর হাকিম (১৮), জিয়াবুল হক (২৮), মো. সিরাজ (৪০), জামাল হোছেন (৩৩), খাইরুল আমিন (২৮), মো. ইদ্রিচ (২৮), আবু তাহের (৪৫), ছৈয়দ আলম (৪০) ও মো. রফিক (২৩)। আটক এসব রোহিঙ্গাদের শুক্রবার সকালে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।  অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো প্রকার ভীতিকর পরিস্থিতি নেই। সব কিছু শান্ত রয়েছে বলে ওসি দাবি করেন।

ঘটনার বিস্তারিত বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আবুল খায়ের বলেন, মূলত বিদেশি সাংবাদিকেরা বৃহস্পতিবার তাদের প্রয়োজনীয় কাজ শেষে ফেরার পথে ৮ ও ৯ বছরের দুজন শিশুকে কাপড়-চোপড় খারাপ অবস্থায় দেখতে পান। তখন বিদেশিরা ওই দুই শিশুসহ তাদের মাকে পাশের লম্বাশিয়া বাজারে নিয়ে কাপড় কিনে দেন। পরে গাড়িতে তুলে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সময় তারা মনে করেন, বিদেশিরা তাদেরকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। এই মনে করে চিৎকার দিলে অন্য রোহিঙ্গারা এসে তাদের পাচারকারী মনে গণপিটুনি দেয়।

এদিকে এ ঘটনার পর থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গারা যেকোনো গুজব ছড়িয়ে বড় ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে ক্যাম্পে। তাই প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও কুতুপালং এলাকার বাসিন্দা বখতিয়ার আহমদ জানান, রোহিঙ্গারা সম্প্রতি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কিছু কিছু রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করে তুলার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার সম্পূর্ণ গুজব ছড়িয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর হামলা করা হয়েছে। আমিসহ পুলিশের সহযোগিতায় বিদেশি সাংবাদিকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ক্যামেরা, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

বখতিয়ার আহমদ লম্বাশিয়া, মধুরছড়াসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে চিহ্নিত কিছু রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা নেতাদের প্রশাসনিক নজরদারী বাড়ানোর জন্য আরআরআরসি, জেলা পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের হামলায় জার্মান সাংবাদিক ইয়োরিকো লিওবি (৪৪), এস্টিপেইন্স অ্যাপল (৪৯) ও গ্রার্ডার স্টেইনার (৬১) এবং তাঁদের বাংলাদেশি দোভাষী মো. সিহাবউদ্দিন (৪১) ও গাড়ির চালক নবীউল আলম (৩০), পুলিশ সদস্য জাকির হোসেন (৩৩) আহত হন। রোহিঙ্গারা বিদেশি সাংবাদিকদের ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুর করে ক্যামেরা, তাদের পাসপোর্ট ও সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ তাদেরকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

জার্মানি সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ির চালক কক্সবাজার টেকপাড়া গ্রামের নবী আলম (৩০) জানান, তাঁরা বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে কুতুপালং ৪ এক্সটেনশন ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও ফটো সেশনসহ বেশ কয়েকজন নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের সময় লম্বাশিয়া ১ নম্বর ক্যাম্পে মাসহ দুটি শিশু কন্যার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে জার্মানি সাংবাদিকরা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এ সময় জার্মানির সাংবাদিকরা ওই তিনজন মা ও শিশু যথাক্রমে বুশেরা বেগম (৯), কাচুনামা আকতার (৮) ও তাদের মা হাসিনা আকতারকে (৩৫) একটি টমটম গাড়িতে করে লম্বাশিয়া বাজারে যেতে বলেন। জার্মানি সাংবাদিকরা তাদেরকে চাহিদামতো ভালো কাপড়চোপড় ও কিছু এমিটেশনের অলংকার কিনে দিয়ে তাদের একটি ভিডিওচিত্র ধারণ করার জন্য গাড়িতে তোলে একটি পরিবেশসম্মত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কালে অপহরণ আতঙ্কে শিশুরা চিৎকার দিয়ে উঠলে উত্তেজিত শতশত রোহিঙ্গা দা, কিরিচ, লাঠিসোঁটা নিয়ে জার্মান সাংবাদিকদের গাড়ি গতিরোধ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় রোহিঙ্গাদের এলোপাতাড়ি মারধরে তিন জার্মানি সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করতে এসে ডিএসবি সদস্য জাকির হোসাইন আহত হন। রোহিঙ্গারা জার্মান সাংবাদিকদের ক্যামেরা, সাউন রেকর্ডার, লাইসেন্স, মানিব্যাগ, তিনটি লাগেজ, পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রাদি লুটপাট করে সাংবাদিকদের জিম্মি করে রাখে। খবর পেয়ে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা লম্বাশিয়া বাজারে রোহিঙ্গাদের ধাওয়া করে সাংবাদিকদের উদ্ধার করে।

এদিকে দুই রোহিঙ্গা শিশু কন্যার মা হাসিনা আকতারের সঙ্গে উখিয়া থানায় দেখা হয়। ঘটনার বিবরণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে জার্মান সাংবাদিকরা অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময় অপহরণ আতঙ্কে শিশু মেয়েরা চিৎকার দিলে রোহিঙ্গারা তাদের উদ্ধার করে।

বাংলাদেশি দোভাষী মো. সিহাব উদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।