ঢাকা, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭, ৩ পৌষ ১৪২৪, স্থানীয় সময়: ১৬:০২:৪৮

রাখাইনে রাতারাতি শান্তি সম্ভব নয় : সু চি

| ৯ অগ্রহায়ন ১৪২৪ | Thursday, November 23, 2017

রাখাইনে রাতারাতি শান্তি সম্ভব নয় : সু চিফাইল ফটো

প্রবল বৈশ্বিক চাপে পড়ে এ সপ্তাহেই বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পরিকল্পনা করছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। তবে তিনি এও বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রাতারাতি সম্ভব নয়।মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে এশিয়া ও ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।

ওই বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আজ বুধবার মিয়ানমারের সঙ্গে দুই দিনব্যাপী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবে। সেই বৈঠকেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি সমঝোতার চেষ্টা চালাবে।

রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের পদক্ষেপ বিষয়ে অ্যামনেষ্টির প্রতিবেদনটি পড়ুন……..

আজ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সচিব পর্যায়ে এবং আগামীকাল মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ চাচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি স্বচ্ছ সমঝোতা। দুই দেশ গত প্রায় দুই মাসে সমঝোতার প্রস্তাব ছয় দফা চালাচালি করেছে। বাংলাদেশ চাচ্ছে সমঝোতা হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে পররাষ্ট্রসচিবদের নেতৃত্বে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন ও কার্যপরিধি ঠিক করার সময়সীমা সুনির্দিষ্ট রাখতে। ওই গ্রুপ গঠন হওয়ার পর মাঠপর্যায়ের ভৌত ব্যবস্থা বিষয়ে আরো একটি সমঝোতা সই করতে চায় বাংলাদেশ। সেখানেই উল্লেখ থাকবে প্রতিদিন কতজন রোহিঙ্গা কোন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে যাবে, রাখাইন রাজ্যে কোথায় থাকবে এসবসহ অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে চাইলেও মিয়ানমার তাতে এখনো নারাজ। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের তথ্যের অমিল হলে যৌথ যাচাই-বাছাই কমিটিকে দিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল ঢাকা। কিন্তু নেপিডো এতে রাজি নয়।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্প্রতি চীনের প্রস্তাব বিষয়ে পড়ুন নিচে ক্লিক করে……………

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে কী ধরনের সমঝোতা হয় সেটিই দেখার বিষয়। কারণ মিয়ানমার ১৯৯২ সালের সমঝোতার ভিত্তিতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করতে চায়। সেই সমঝোতা পুরোপুরি মেনে চললে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগকেই প্রত্যাবাসন করা কঠিন হবে। কারণ মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়নি। আবার তারা এমনভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে যে তাদের মিয়ানমারে এখন স্থানীয় ঠিকানা যাচাই করাই কঠিন হবে।

তা ছাড়া মিয়ানমার গত বছর অক্টোবর মাসের আগে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার ওই অবস্থানে থাকলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টার ফল নিয়ে শুরুতেই প্রশ্ন উঠতে পারে। কেননা গত বছর অক্টোবর মাসে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা শুরুর আগে বিভিন্ন সময় ওই দেশটি থেকে আসা তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক জানান, বাংলাদেশ যে সমঝোতা বা চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে তার লক্ষ্য প্রত্যাবাসন। অর্থাৎ রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরে যাবে। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যেমন ফেরত পাঠাবে না, তেমনি মিয়ানমারও ফেরত নেবে না। তিনি বলেন, সমঝোতা বা চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাইয়ের মতো বিষয় থাকবে। এর পরও ফিরে যাওয়ার বিষয়টি রোহিঙ্গাদের ওপরই নির্ভর করবে। যে পর্যন্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি বা বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয়শিবিরের চেয়ে নিরাপদ ও উজ্জ্বলতর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না হবে সে পর্যন্ত তারা ফিরে যেতে আগ্রহী হবে বলে মনে হয় না।

রাখাইন রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রাতারাতি সম্ভব নয় বলে সু চি যে মন্তব্য করেছেন তাকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন ওই কূটনীতিক। তিনি বলেন, ২০০৫ সাল থেকেই মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একতরফাভাবে বন্ধ রেখেছে। ২০১১ সালে মিয়ানমার বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুই হাজার ৪১৫ জনকে তার দেশের নাগরিক বলে স্বীকার করলেও এত দিনেও তাদের প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। মিয়ানমার যেমন তাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি, তেমনি ওই রোহিঙ্গারাও ফিরতে চায়নি।

ওই কূটনীতিক বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ও ‘গণহত্যা’র অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে কে সেখানে ফিরে যেতে চাইবে? বাংলাদেশও বলছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতে হবে টেকসই ও সম্মানজনক। অর্থাৎ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যাতে রোহিঙ্গাদের একবার গিয়ে আবার ফিরে আসতে না হয়।

কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জাতিসংঘের র‌্যাপিড রেসপন্স টিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ মিয়ানমারে ফিরতে চায়। তবে তারা পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। সেগুলোর প্রথমটি হলো—তাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো, তাদের নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকার দিতে হবে। তৃতীয়, তাদের জীবন-জীবিকা বিনষ্টের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। চতুর্থ, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিচার হতে হবে এবং পঞ্চম শর্ত, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করতে হবে। এগুলোর বাইরে আবার অনেকে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নকেও শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এসব শর্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে পূরণ করা সত্যিই কঠিন। এর পরও বাংলাদেশ চাচ্ছে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসনবিষয়ক সমঝোতা বা চুক্তি সইয়ের মধ্যে এ সমস্যা সমাধানের একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে। এটি বাস্তবায়নে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং জনগণের বড় অংশের জোরালো সমর্থন প্রয়োজন। দৃশ্যত রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সু চির বেসামরিক সরকার ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। গতকাল সু চি যখন এ সপ্তাহের মধ্যেই প্রত্যাবাসনবিষয়ক সমঝোতা সইয়ের আশার কথা বলেছেন, তখন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল অং মিন হ্লাইং চীন সফরে গেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ ফেদেরিকা মগেরিনিসহ ১৫টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গত সোমবার মিয়ানমারে এশিয়া-ইউরোপ মিটিংয়ের (আসেম) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আগে সু চিকে অনতিবিলম্বে সংঘাত বন্ধ, রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী স্রোত থামানো এবং বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। ওই বৈঠকে অংশ নেয়নি এমন দেশগুলোও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়।

মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান গত রাতে বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘সমস্যা ও সমাধান দুটিই মিয়ানমারে। এখন আমরা যে বিষয়টি নিয়ে অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে কাজ করছি সেটি এর অংশ মাত্র। বাংলাদেশে যে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের ফেরত যাওয়ার বিষয়টিই এখন আমরা দেখছি। ’

তিনি বলেন, ‘সফল প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হলেই যে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়। আমরা আশা করছি, দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটি প্রত্যাবাসন ব্যবস্থায় উপনীত হতে পারব। ’

রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান বলেন, ‘যতক্ষণ ওই লোকগুলো বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং তাদের প্রত্যাবাসন করা না যাবে—ততক্ষণ আমরা এটিকেই দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে বুঝি। পরবর্তীতে তারা মিয়ানমারে যাওয়ার পর সেখানে কিভাবে ওই সমাজে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তাদের স্বীকৃতি ও অবস্থার উন্নতি হবে এ বিষয়গুলো রয়ে যাবে। সুতরাং দ্বিপক্ষীয়ভাবে বিষয়টির সমাধান কখনোই হবে না। ’

তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা সফল প্রত্যাবাসনের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি। এ থেকে বোঝা যায়, এ সংকট কেবল প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই সমাধান হওয়ার নয়। ’

তিনি আরো বলেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় মিয়ানমার এ ইস্যুতে অনেক বেশি চাপে পড়েছে। আমরা আশা করি, এবার একটি ইতিবাচক ফল আসবে।