ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, স্থানীয় সময়: ০৮:৪৮:২৯

বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস

স্বাস্থ্য ও বিনোদন | ২৬ ভাদ্র ১৪২৪ | Sunday, September 10, 2017

১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। ২০১৭ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Take a minute Change a life’  ‘একটি মিনিট সময় নিন : জীবন পরিবর্তন করুন’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে আত্মহত্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রতি আশপাশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা বিষণ্ণতায় ভুগছেন, যাঁদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সমস্যা আছে, যাঁরা মাদকে আসক্ত, যাঁদের জীবনে ঘটে গেছে বড় কোনো দুর্ঘটনা, যাঁরা নিয়ত সামাজিক চাপের মধ্যে রয়েছেন, তাঁরা আত্মহত্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে যা যা করণীয়
১. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি- বিভিন্ন ধর্মে ও সংস্কৃতিতে  আত্মহত্যাকারী বা আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর পরিবার সামাজিকভাবে হেয় হন। এ কারণে যাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ইচ্ছা আছে, তাঁরা কোনো সাহায্য নিতে এগিয়ে আসতে দ্বিধাবোধ করেন, কোনো সহায়তা পান না। ফলে বাধ্য হয়ে একসময় আত্মহত্যা করে ফেলেন। যদি আত্মহত্যার বিষয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন  ঘটিয়ে সবাইকে বিশ্বাস করানো যায় যে আত্মহত্যার ইচ্ছা একটি ভুল মানসিক প্রক্রিয়া এবং এ থেকে বাঁচার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন তবে অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। মোটকথা আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

২. আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্তি রোধ করা : বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে আত্মহত্যার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কীটনাশক ও স্লিপিং পিল। লাইসেন্সের মাধ্যমে কীটনাশকের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং কৃষকের বাড়িতেও তা এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে সহজে কেউ তার নাগাল না পায়। সেই সঙ্গে প্রেসক্রিপশন ছাড়া সব ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করার কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।

৩. মিডিয়ার  ভূমিকা পরিবর্তন : আত্মহত্যার কৌশল ও মাধ্যম নিয়ে ফলাও করে পত্রিকায় বা টিভিতে সংবাদ প্রচার হলে ওই কৌশলে আত্মহত্যা করার হার বেড়ে যেতে পারে। অস্ট্রিয়ায় ১৯৮৪ সাল থেকে সাব-ওয়েতে ট্রেনের সামনে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার খবর নতুন পদ্ধতি হিসেবে ব্যাপক প্রচার পেতে থাকে। এতে করে এই পদ্ধতিতে আত্মহত্যার হার এমন উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকে যে ‘অস্ট্রিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন’ এ ধরনের রিপোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। এই প্রচারণা শুরুর ছয় মাসের মধ্যে সাব-ওয়েতে আত্মহত্যার হার  অনেক কমে আসে। তাই আত্মহত্যার খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। আত্মহত্যার সংবাদ মিডিয়ায় কীভাবে প্রকাশিত-প্রচারিত হবে সে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি নীতিমালা রয়েছে, যা মেনে চলা সব প্রচারমাধ্যমের জন্য জরুরি।

৪. ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির প্রতি বিশেষ সহায়তা : মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক রোগী, অভিবাসী, বেকার ও সাংস্কৃতিকভাবে শ্রেণিচ্যুতদের  মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। এ কারণে তাদের প্রতি বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।

৫. সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধি- নগরায়ন ও শিল্পায়নের প্রভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে মানুষ। ভাঙছে পারিবারিক কাঠামো আর কমছে সামাজিক বন্ধন। পারিবারিক বন্ধন বাড়ানো, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, অনেকে মিলে খেলা যায় এমন খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি সেই সঙ্গে ধর্মাচরণ মেনে চলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো যায়।

৬. মানসিক রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা : গবেষণায় দেখা যায় আত্মহত্যাকালীন ৯৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে মানসিক অসুস্থতা বিরাজ করে। বিষণ্ণতা, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের বিকার, সিজোফ্রেনিয়াসহ নানাবিধ মানসিক রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে বহু আত্মহত্যা কমানো যাবে। মানসিক রোগের অপচিকিৎসা বন্ধেও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

৭. নারীর ক্ষমতায়ন : আমাদের দেশে যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন এবং উত্ত্যক্তকরণের ফলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব কারণ দূর করার জন্য প্রয়োজন নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন। নারীর প্রতি নারী-পুরুষ সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করাও আত্মহত্যা প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

৮. বিশেষ পরামর্শ সেবা : যাঁরা আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন (ছাত্রী, নববিবাহিত বা বিবাহযোগ্য বয়সের তরুণী, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মাদকসেবী, মানসিক রোগী, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার যাঁরা) তাঁদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা এলাকাভিত্তিক বিশেষ পরামর্শ সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ থাকতে হবে। যেখানে আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক বা কাউন্সিলররা সবাইকে সাধারণভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয়াদি সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন, পাশাপাশি কারো মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা বা ইচ্ছা দেখা দিলে তা রোধ করার উদ্যোগ নেবেন।

৯. সার্বক্ষণিক টেলিফোন সহায়তা : জাতীয় পর্যায়ে সার্বক্ষণিক টেলিফোনে সাহায্য পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। কারো মধ্যে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জন্মালে বা জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে তিনি যেন এই বিশেষ নম্বরগুলোতে ফোন করে সুপরামর্শ পান। এই টেলিফোনগুলোর  সাহায্যকারী প্রান্তে  সব সময়  থাকবেন ‘মনোচিকিৎসক-কাউন্সিলর

মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট-আইনজীবী-পুলিশ-সমাজকর্মী’ সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম যাঁরা সাহায্য প্রার্থনাকারী ব্যক্তিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে টেলিফোনে বা সরাসরি উপস্থিত হয়ে আত্মহত্যার পথ থেকে ফেরাবেন ও মানসিক বিপর্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেবেন। প্রয়োজনে আইনি সহায়তাও দেবেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে এ ধরনের টেলিফোন সার্ভিস চালু আছে। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে কার্যকরী এই পদ্ধতি শুরু করা যেতে পারে।

লেখক : ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

আরও পড়ুন...