ঢাকা, এপ্রিল ২০, ২০১৯, ৬ বৈশাখ ১৪২৬, স্থানীয় সময়: ০৫:০৫:৫৬

আবু সালেককে নিয়ে চিঠি চালাচালি, বিব্রত ইসি!

আইন ও মানবাধিকার | ২৯ মাঘ ১৪২৫ | Monday, February 11, 2019

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে ৩৩টি মামলার আসামি আবু সালেক। ছবি: সংগৃহীত

সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে ৩৩টি মামলার আসামি আবু সালেক নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনস্থ একজন কর্মী ছিলেন বলে দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ নিয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চিঠি চালাচালিও হয়েছে।

আবু সালেক নামের কোনো ব্যক্তি অতীতে বা বর্তমানে কোনোকালেই কর্মরত ছিল না বা নেই বলে চিঠি দিয়ে দুদককে জানিয়েছে ইসি। এরপরও সালেক ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগে (এনআইডি) ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে গণমাধ্যমে দুদক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বিব্রত ইসি। দুদক কেন এসব তথ্য গণমাধ্যমে ছড়াচ্ছে তার ব্যাখ্যা চাওয়ারও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এনআইডি।

এনআইডির বৈধ ও সঠিকতা যাচাইকরণ ইউনিট সূত্র, দুদকের দেওয়া চিঠি ও ইসির দেওয়া চিঠির জবাব থেকে জানা যায়, সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির রহস্য উদঘাটনে গত বছরের ৭ আগস্ট আবু সালেক ও জাহালমসহ মোট পাঁচজনের বিষয়ে ইসির কাছে তথ্য চেয়ে দুটি চিঠি দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের পরিচালক শেখ মেসবাহ উদ্দিন এবং আরেক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক সেলিনা আখতার মনি। চিঠিতে পাঁচজনের পৃথক পৃথক তথ্য চাওয়া হয়। সেই সঙ্গে আবু সালেক নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ে এবং কমিশনের কোনো প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন বা আছে কিনা জানতে চাওয়া হয়।

তথ্য যাচাই-বাছাই করে ১৪ আগস্ট চিঠির জবাব দেয় ইসি। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এনআইডির বৈধ ও সঠিকতা যাচাইকরণ ইউনিটের সহকারী পরিচালক মুহা. সারওয়ার হোসেন।

ইসির চিঠি থেকে জানা যায়, দুদক যে পাঁচজন ব্যক্তির তথ্য চেয়েছিল তার ভেতর চারজনের তথ্য খুঁজে পায় ইসি। এঁরা হলেন মো. আবু সালেক, মো. জাহালম, গায়ত্রী রানী বিশ্বাস ও গোলাম মোর্ত্তজা। বাকি একজনের তথ্য পায়নি ইসি।

ওই চারজনের মধ্যে আবু সালেকের বাবার নাম মো. আব্দুল কুদ্দুস। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সিংগিয়াতে। জাহালমের বাবার নাম মো. ইউসুফ আলী। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার  ধুবড়িয়াতে। গায়ত্রী রানী বিশ্বাসের বাবার নাম কার্তিক চন্দ্র সরকার। স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা নড়াইল জেলার লোহাগড়া পৌরসভায়। গোলাম মোর্ত্তজার বাবার নাম ছামাদ মোল্যা। বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা লোহাগড়া পৌরসভায়।

আর সালেকের ব্যাপারে ইসির চিঠিতে বলা হয়, ‘জবাব আবু সালেক বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ে এবং কমিশনের কোনো প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন বা আছে কিনা এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট জনবল ও আইডিইএ প্রকল্পের মানবসম্পদ শাখায় তথ্য চাওয়া হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে উক্ত নামের কোনো ব্যক্তি অতীতে বা বর্তমানে কোনো কালেই কর্মরত ছিল না/নেই।’

এসব চিঠির ব্যাপারে জানতে চাইলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানি না। দুদক চিঠি দিলে তো আমি জানতাম।’

নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রথম আপনার কাছ থেকে শুনছি। আমাকে জানানো হয়নি।’

চিঠির বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম প্রথমে অস্বীকার করেন। চিঠি দেখানোর পরে তিনি এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেন।

সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘দুদক তথ্য চেয়ে আমাদের কাছে চিঠি দিয়েছিল। ওই বিষয়ে তদন্ত করে আমরা দুদককে জানিয়েছিলাম, আবু সালেক নির্বাচন কমিশনে কিংবা এনআইডির কোনো প্রকল্পে কখনো যুক্ত ছিলেন না এবং এখনো নেই।’

এদিকে সালেকের বদলে তিন বছর কারাভোগ করেন টাঙ্গাইলের নিরীহ পাটকল শ্রমিক জাহালম। হাইকোর্টের এক নির্দেশের পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম। নিরপরাধ জাহালমের কারাভোগে নিজেদের ভুলের কথা স্বীকার করে নিয়েছে দুদক।

ভুল স্বীকার করে দুদক কমিশনার এএফএম আমিনুল ইসলাম গত ৬ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আবু সালেকের ব্যাপারে দুদক নতুন করে তদন্ত করবে। তবে এরই মধ্যে যেটা দুদক পেয়েছে তা হলো- আবু সালেক এক সময় এনআইডি কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) প্রকল্পে কাজ করতেন। সেখান থেকেই কীভাবে আইডি কার্ড জাল করা যায় সেসব রপ্ত করেছেন। জাল পরিচয়পত্র তৈরি করে তিনি শুধু ছবি পরিবর্তন করে ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটান। যে কারণে ব্যাংক কর্মকর্তারা জাহালমকেই চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধানের সময়ও নিরীহ ব্যক্তিটিই আবু সালেক হিসেবে চিহ্নিত হয়।’

এ ব্যাপারে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক বলেন, ‘জাহালম মুক্তি পাওয়ার পর দুদকের বরাত দিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর দেখলাম, সালেক নাকি নির্বাচন কমিশনে কাজ করত। আমি পুনরায় আবার খোঁজ-খবর নিলাম, তদন্ত করলাম। কিন্তু সালেক ইসির কর্মকর্তা বা কোনো প্রকল্পে যুক্ত ছিলো এমন কোনো তথ্য আমরা কোথাও পাইনি। এখন কী কারণে দুদক এসব বলছে আমরা জানি না। তবে দুদকের কাছে মৌখিকভাবে হোক আর লিখিতভাবে হোক আমরা জানতে চাইব, কেন সালেককে এখানকার প্রকল্পের কর্মকর্তা বলছে। খানিকটা বিব্রতকর বিষয়টি।’

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘দুদক সালেককে আমাদের এখানকার কর্মকর্তা বললে দায়টা কিন্তু আলটিমেটলি আমাদের ওপরই পড়ে। তবে আমরা এই ব্যাপারে কোনো তথ্য খুঁজে পাইনি। এটা আসলেই বিব্রতকর। আমরা প্রয়োজনে আবারো তদন্ত করে দেখব।’

তবে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের দাবি, আবু সালেক ইসির এনআইডির একটি প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন।  এ বিষয়ে তাদের কাছে তথ্যও রয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আরো বিস্তারিত বের হয়ে আসবে।

ইসি তো স্পষ্ট করেই দুদককে জানিয়েছিল, অতীতে বা বর্তমানে আবু সালেক নামের কোনো ব্যক্তি ইসি বা ইসির কোনো প্রকল্পে কর্মরত ছিল না এবং নেই। তাহলে আপনারা কীভাবে তাকে এনআইডির সাবেক ডাটা এন্ট্রি অপারেটর বলছেন-এমন প্রশ্নে দুদক চেয়ারম্যান এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের রেকর্ডপত্রে যা আছে আমি সেই অনুসারে বলেছি সে (আবু সালেক) এনআইডিতে কাজ করত। এখন প্রকল্পে না কিসে আমি ঠিক বলতে পারব না। সব চেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমরা তো ইনকোয়ারি বসিয়েছি, ইনকোয়ারিতেই সব চলে আসবে। আর কমিশন থেকে যদি এমন তথ্য দুদককে দিয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় যারা এই মামলার ইনভেস্টিগেশন করেছে তারা এগুলো দেখেছে বা কনসিডার করেছে।’

এসব ব্যাপারে কথা হয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের বৈধ ও সঠিকতা যাচাইকরণ ইউনিট থেকে যদি দুদককে স্পষ্ট করেই জানানো হয়ে থাকে তাহলে দুদক কেন সালেককে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর বলে ইসির ওপর দায় চাপাচ্ছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক বিষয়। যদিও এই মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে দুদকের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুদক এবং ইসিকে এই বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া খুবই জরুরি। না হলে এই মামলার বিচার মানুষকে আরো ধোয়াশাতে ফেলবে।’