ঢাকা, মার্চ ২৬, ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৫, স্থানীয় সময়: ১৮:৩১:১৮

এ পাতার অন্যান্য সংবাদ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের নকশা দেখলেন প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা নজরদারিতে নায়িকা শিমলা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা বাতিল চলতি বছরেই : সচিব সঙ্গীত শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহর দাফন সম্পন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশে পাকিস্তানের গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরবে জাতিসংঘ কাল ভয়াল ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠক ১ এপ্রিল কাল স্বাধীনতা পুরস্কার দেবেন প্রধানমন্ত্রী প্যারেড স্কোয়ারে সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর সমরাস্ত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করলেন জাতিসংঘ উপদেষ্টা

আজ শুভ নিত্যনন্দ ত্রয়োদশী

দেশের খবর | ৬ ফাল্গুন ১৪২৫ | Monday, February 18, 2019

আজ পরমদয়াল পতিতপাবন প্রেমদাতা নিত্যানন্দ প্রভুর আর্বিভাবতিথি  শুভ নিত্যানন্দ ত্রয়োদশী। বীরভূম জেলায় অবস্থিত একচক্রাধামে কলিযুগপাবনাবতার, প্রেমদাতা, পরমদয়াল, করুনাময় শ্রী নিত্যানন্দ প্রভুর আর্বিভূত হন। পিতা নাম শ্রী হাড়াই পন্ডিত, মা শ্রীমতি পদ্মাবতী। পিতামাতার কোলে সাতটি সন্তানের মধ্যে নিত্যানন্দ ছিলেন জ্যেষ্ঠ। অন্যদের নাম কৃষ্ণানন্দ, সর্বানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, পুর্ণানন্দ, প্রেমানন্দ, ও বিশুদ্ধানন্দ। প্রভুর শিশুবেলার নাম ছিল কুবের। শৈশবে মাত্র বার বছর বয়সে জনৈক সন্ন্যাসীর সাথে তীর্থ ভ্রমণ বের হন। তখন তিনি অবধুত সংস্কারমুক্ত ও পরম পবিত্র । কোন সংকীর্ণতা স্পর্শ করতে পারেনি এই অবধুত সন্ন্যাসীকে। দয়াল নিতাই প্রেমময় নিতাই গোপবেশে বৃন্দাবনে জনে জনে জিজ্ঞাসু নয়নে খুজে বেড়িয়েছেন ভাই কানাইয়ের অনুসন্ধানে । শুনলেন নবদ্বীপে গিয়েছেন ভাই কানাই। নন্দনাচার্য্যের বাড়ীতে প্রথম মিলন হয় গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু সাথে পরম দয়ালু নিত্যানন্দের। শ্রীবাস আঙ্গিনা থেকে শুরু হয় আমাদের পরমদয়াল পতিতপাবন প্রেমদাতা নিত্যানন্দের হরিনাম সংকীর্তনের বিজয়যাত্রা ।
নিত্যানন্দ ত্রয়োদশী এর চিত্র ফলাফল

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজের শ্রী নিত্যানন্দ ত্রয়োদশী বার্তা

” নিত্যানন্দ প্রভু কৃপার সর্বোচ্চ সীমার মূর্ত প্রকাশ। পরম করুণাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যের কৃপা নিত্যানন্দ প্রভুর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তিনি সর্বদা মত্ত হাতির ন্যায় দ্বারে দ্বারে যেয়ে প্রত্যেককে ভগবান শ্রীহরির নাম জপ করতে নিয়ত অনুরোধ করেছেন। এর মাধ্যমে শ্রেষ্ঠতম পরমগুহ্য বিষয়- কৃষ্ণপ্রেম যোগ্য- অযোগ্য নির্বিশেষে সকলের মাঝে বিতরিত হল। নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীহরির নাম বিতরণের মাধ্যমে কলির প্রভাবকে দমন করেন। যাদের কোন আশা নেই তাদের একমাত্র আশা হলেন তিনি। এই পরম মঙ্গলময় দিনে নিতাই প্রভুর নিকট আমরা বিনীত প্রার্থনা জানাই - দয়া কর মোরে নিতাই!

আপনাদের নিত্য হিতাকাঙ্ক্ষী,
জয়পতাকা স্বামী। ”

পদকর্তা-শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর
বলছেন
========================
নিতাই-পদকমল, কোটিচন্দ্র-সুশী
তল,
যে ছায়ায় জগৎ জুড়ায়।
হেন নিতাই বিনে ভাই, রাধাকৃষ্ণ পাইতে
নাই,
দৃঢ় করি’ ধর নিতাইর পায়।।
সে সম্বন্ধ নাহি যা’র বৃথা জন্ম গেল
তা’র,
সেই পশু বড় দুরাচার।
নিতাই না বলিল মুখে, মজিল সংসার
সুখে,
বিদ্যা-কুলে কি করিবে তার।।
অহঙ্কারে মত্ত হৈঞা, নিতাই-পদপাসরিয়া,
অসত্যেরে সত্য করি’ মানি।
নিতাইয়ের করুনা হ’বে, ব্রজে
রাধাকৃষ্ণ পাবে,
ধর নিতাইয়ের চরণ দু’ খানি।।
নিতাইয়ের চরণ সত্য, তাঁহার সেবক
নিত্য,
নিতাই-পদ সদা কর আশ।
নরোত্তম বড় দুঃখী, নিতাই
মোরে কর সুখী,
রাখ রাঙ্গা-চরণের পাশ।।

নিত্যানন্দ প্রভুর বিভিন্ন লীলারহস্য

শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে বিভিন্ন গো-পালেরা ছিলেন, কৃষ্ণলীলার সখারা এসেছিলেন এবং তাঁরা শৈশব লীলা করেছিলেন নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে। তাঁরা নিয়মিত নাটক করতেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের খেলা ছিল ভাগবতে রামায়ণে যে সমস্ত লীলা আছে, রামলীলা, নানা অবতার লীলা তাঁরা অভিনয় করতেন। প্রতিবেশীরা আশ্চর্য হতেন যে, এই বালকেরা কি করে জানলো কি কি হলো, কোথায় হলো, কোনও রকম শিক্ষা তো তাদের দেওয়া হয়নি।

একটি সুন্দর লীলা হয়েছিলÑনিত্যানন্দ প্রভু রামলীলা করছিলেন, ল²ণের অভিনয়। একটা ছেলে ছিল ইন্দ্রজিৎ, সে শক্তিশেল মারল। নিত্যানন্দ প্রভু অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। আর সেই সঙ্গে তাঁর মা পদ্মাবতী দেবী এসেছেন, নিত্যানন্দ প্রভুর তখন প্রসাদের সময় হয়েছে। মায়েরা যেমন খেলার মধ্যে গিয়ে বলেন, খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে, øান করতে হবে চলো; সেইভাবে বাচ্চারা সবাই প্রস্তুত কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন, তখনও শক্তিসেল বিদ্ধ। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসও নেই। তখন দেখা গেল যে মারাই গেছেন, সবাই ডাক্তার ডেকে আনতে গেল। কেউ স্থির করতে পারলেন না, কি করে কি করা যায়।

ছেলেদেরকে লোকেরা তখন বলল, ও কি করছিল? ছেলেরা বলল, Ñও তো রামলীলা করছিল। ল²ণ ইন্দ্রজিতের শক্তিশেলে বিদ্ধ হয়েছে, হনুমান গন্ধমাদন পাহাড় থেকে বিশল্যকরণী নিয়ে এসে সেই পাতার রস দিলে ল²ণের চেতনা ফিরবে। তাই আমাদের সেই লীলা পূর্ণ করতে দাও। তখন সেই ছেলেটাকে ডেকে আনলÑকে হনুমান হয়েছেÑতাড়াতাড়ি যাও পাহাড়ে। সে সেখানে গিয়ে কাঁধে করে একটি ছোট গাছ উঠিয়ে এনে নিত্যানন্দ প্রভুর নাকে সেই গাছের পাতার রস দিল। তখন নিত্যানন্দ প্রভুর চেতনা ফিরে এলো। তাঁরা লীলায় এতই মগ্ন ছিলেন।

তাঁরা এই সব লীলা প্রকাশ করছিলেন। এইভাবে অনেক সুখের দিন কেটেছে বিভিন্ন বন্ধুদের সঙ্গে, যাঁরা বয়স্ক ছিলেন তাঁরাও নিত্যান্দ সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন।

হাড়াই ওঝা ছিলেন ব্রাহ্মণ। তিনি তাঁর ছেলেকে কাছাকাছি রাখতেন। একদিন এক সন্ন্যাসী এসেছেন হাড়াই ওঝার বাড়িতে। সন্ন্যাসী কৃষ্ণকথা আলোচনা করলেন এবং পরে প্রসাদ পেলেন। এইভাবে এক-দুই দিন কেটে গেল। তিনি চলে যাবার সময় হলে হাড়াই ওঝা বললেন, আপনার জন্য কিছু সেবা করতে পারি?

তিনি বললেন, আমি যা চাইব তা-ই তুমি দেবে? তখন ‘নি-ত্যা-ন-ন্দ’ বলে কেঁদে উঠেছেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি আর অচেতন হয়ে পড়লেন। জেগে উঠে মনে করলেন, এটা কি সত্যি? আমি নিত্যানন্দকে দেব? ব্রহ্মচারী হিসাবে সন্ন্যাসীর সেবা করবে? হাড়াই পণ্ডিতের মাথা ঘুরছেÑনিত্যানন্দ ছাড়া তো বাঁচব না। তখন তিনি ভাবছেন, ব্রাহ্মণের কাছে কথা তো দিয়েছি। তো আমি যদি এখন মিথ্যা কথা বলি, নিত্যানন্দ তা হলে ধর্মের নিয়ম ভুল শিখবে। তাঁর ছেলেকে দৃষ্টান্ত দেওয়ার জন্য তাকে তার সেই উচ্চ পর্যায়ের আদর্শের প্রতিশ্র”তি অনুসারে নিত্যানন্দকে সন্ন্যাসীর সাথে দিতে রাজী হলেন। তখন তাঁর চোখ দিয়ে অশ্র” ঝড়ে পড়ছে সব সময়ে। তাঁরা চলে গেলে হাড়াই ওঝা নিত্যানন্দের বিরহে প্রাণত্যাগ করলেন।

অনেক বছর পর, নিত্যানন্দ প্রভু এই পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর জাহ্নবী দেবী একচক্রে গিয়েছিলেন। এক বৃদ্ধ লোকের সঙ্গে দেখা হলোÑতাঁর চোখে অশ্র”Ñজপ করছিলেন। তিনি শুনলেনÑ‘নিত্যানন্দ! নিত্যানন্দ!’ বলে কান্নাকাটি করছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেনÑ‘নিত্যানন্দ’ বলে কান্নাকাটি করছেন কেন? তিনি বললেনÑকেন নয়? তিনি ছিলেন এই গ্রামের প্রাণস্বরূপ, তাঁকে ছাড়া আমরা কিছু জানতাম না, তিনি সবাইকে দিব্য আনন্দ দান করতেন। হাড়াই ওঝা কেন ওকে কোথায় দিলেন, আরও কত ছেলে ছিল, সারা গ্রাম প্রাণশূন্য হয়ে গেল। তাদের জীবন ধারণের আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। তাই কেউ কেউ নবদ্বীপে চলে গেল।Ñএই বলে আবার কান্নাকাটি শুরু করলেন। জীবনভর তিনি নিত্যানন্দের বাল্যলীলা চিন্তা করছিলেন।

নিত্যানন্দ প্রভু বারো বছর বয়সে বেরোলেন সারা ভারতবর্ষে তীর্থ করতে। সমস্ত পবিত্র নদীগুলি পবিত্র করলেনÑ এই সব নদীগুলি তাঁর সঙ্গ লাভের জন্য অপেক্ষা করছিলÑঠিক যেমন বলরাম নানা তীর্থে ঘুরেছিলেন। বৃন্দাবনে গেলেন, সেখানে গাভীরা, ব্রজবাসীরা, হরিণরা অভ্যর্থনা প্রার্থনা করছেÑবৃন্দাবনে পুনরায় তিনি এসেছেন বলে।

তারপর তিনি শুনলেন যে, শ্রীকৃষ্ণ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু রূপে এসেছেন আর তাঁর সংকীর্তন যজ্ঞ শুরু করেছেনÑএখন নবদ্বীপে যাওয়ার সময় হয়েছে। সেখানে তিনি নন্দনাচার্যের বাড়িতে ছিলেন (আমাদের মন্দিরের পাশে যে মন্দিরটি ওটি নন্দনাচার্যের বাড়ি ছিল)। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেনÑআমার নিত্য সঙ্গী, আমার অংশ, আমার ভাই নিত্যানন্দÑসে এসেছে এখানে, তোমরা তাকে খুঁজে নিয়ে এসো।

ভক্তরা খুঁজতে বেরুলেন, লোকেদের দ্বারে দ্বারে টোকা দিয়েÑলোকেরা বলতে লাগল, কী করছো, আমরা এখন বিশ্রাম করছি, ইত্যাদি, নিত্যানন্দ বলে এখানে কেউ নেই। সর্বত্র খুঁজে খুঁজে তাঁরা ফিরে এলেন শূন্য হাতে।

মহাপ্রভু বললেন, তোমরা পাবে না, ভগবানকে ঐভাবে খুঁজে পাবে না। তিনি নিজেকে প্রকাশ করলে তবে পাবে। কেবল ভক্তির মাধ্যমেই ভগবানকে খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন আমি খুঁজে পেতে পারি, তোমাদের যেতে হবে না, আমি যাবো। সে আমার কাছ থেকে লুকোতে পারবে না।

পরের দিন মহাপ্রভু কীর্তনদল নিয়ে নবদ্বপ নগর গেলেন। যখন নন্দনাচার্যের বাড়ির কাছে গেছেন, নিত্যানন্দ প্রভু কীর্তনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেনÑকরতাল, মৃদঙ্গ। তখন তিনি লাফিয়ে উঠেছেন। মহাপ্রভুও সোজাসুজি নন্দনাচার্যের বাড়িতে ঢুকে পড়েছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তখন নিত্যানন্দ প্রভুকে জড়িয়ে ধরে ‘নি-ত্যা-ন-ন্দ’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছেন। আর নিত্যানন্দ প্রভু ‘গৌ-রা-ঙ্গ’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছেন। দুজনে দুজনের দিকে ছুটে গেলেনÑতাঁদের অশ্র” ঝরে পড়ছে। আর সমস্ত ভক্তরাÑ‘গৌরহরি বোল হরিবোল’ বলে একই আনন্দ আস্বাদন করতে লাগলেন। সমস্ত দেবতারা দেখতে এসেছিলেন কৃষ্ণ-বলরামের মিলন। তখন তাঁরা পুষ্পবৃষ্টি করছিলেন আকাশ থেকে। এই যে মহামিলনÑলোকে দেখে বলতে লাগল কারা এরা, এত সুন্দর, আগে তো দেখিনি এবং সকলে ‘নিতাই গৌরাঙ্গ’ বলে যোগ দিল।

নবদ্বীপে তাঁদের অনেক লীলা আছে, বিশেষ করে শ্রীবাস ঠাকুরের বাড়িতেÑ সেখানে নিত্যানন্দ প্রভু বাল্যভাব অবলম্বন করতেন। এক সময়ে শচীমাতা জেগে উঠে নিমাইকে ডেকে বলছেনÑআমি একটা স্বপ্ন দেখলাম বুঝতে পারলাম না; বলতে পারো কি এর অর্থ? Ñদেখলাম যেন কৃষ্ণ বলরামের বিগ্রহ এখানে আছে, আমি ভোগ নিবেদন করছি। সামনে দুটি শিশু, তুমি আর নিত্যানন্দ যেন। নিত্যানন্দ সেই বিগ্রহকে বলছেÑএই ভোগ তোমার জন্য নয়, এখন কলিযুগ, এটা চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্য, গৌরাঙ্গের জন্যে!

নিমাই তখন বললেন, মা, নিত্যানন্দ বোধ হয় খুব ক্ষুধার্ত, নিত্যানন্দকে একটু দুপুরে খাওয়াতে হবে। তোমার বিগ্রহগুলি খুব কাজের তো, কিছু লীলা করেছে, কে বুঝতে পারে এই সব লীলা। বলো তো আমি এখনি গিয়ে নিত্যানন্দকে নিমন্ত্রণ করে আসি।

শচীমা তো খুব খুশি গৌর নিতাইকে খাওয়াবেন, Ñতক্ষুণি ছুটলেন রান্নাঘরের দিকে। মহাপ্রভু তাঁকে খুঁজতে গিয়ে শুনলেন তিনি গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গেছেন। খবর পেয়ে নিত্যানন্দ সাঁতরে কাছে এলেন। নিমাই তখন বললেন, শোনো, আজ তুমি আমার সঙ্গে প্রসাদ পাবে, শচীমা রান্না করেছেন। তবে খবরদার কোন পাগলামি করবে না। নিত্যানন্দ প্রভু বলছেন, বলো কি। আমি তো পাগলামি করি না, তুমি তো পাগলামি করো। এইভাবে দুই ভাই- এ কথা বলছিলÑদেখা যাক কে পাগলামি করে।

এদিকে শচীমা ভোগ নিবেদন করেছেন কৃষ্ণ বলরামের সামনে। আর গৌর নিত্যানন্দের জন্য থালা পেতেছেন পরম আনন্দে তিনি তিন খানা থালা পেতেছেনÑ কে জানে কেন। হিসাব হারিয়ে ফেলেছেন, যদিও দু’জন আছেন সেখানে। ভেতরে গেছেন, বহু রকম ব্যঞ্জন রান্না করেছেন, সেগুলি নিয়ে যখন এসেছেন, দেখছেন আসনে গৌর নিতাই কই? বিগ্রহগুলিÑকৃষ্ণ বলরাম বসে বসে প্রসাদ খাচ্ছে। তিনি তখন সঙ্গে সঙ্গে মূর্চ্ছা গেছেন। পরে জেগে উঠেছেন, তখন নিমাই এসে গেছেনÑকি হয়েছে মা তোমার। তিনি দেখেন, কৃষ্ণ বলরামের জায়গায় গৌরাঙ্গ নিত্যানন্দ। তখন তিনি কাঁদতে শুরু করেছেন এবং ছুটে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।

একদিন নিত্যানন্দ প্রভুকে মহাপ্রভু বলেছেনÑতোমার ব্যাসপূজা করবো আগামীকাল। তখন শ্রীবাস ঠাকুরের বাড়িতে আগের দিন অধিবাস করলেন। বলে দিলেন, বাইরের লোক যেন কেউ না আসে এখানে শুধু ভক্তরা থাকবে। বড় কীর্তন হচ্ছে, নৃত্য করছে, একবার নিত্যানন্দ প্রভু চেষ্টা করছেন মহাপ্রভুর চরণ থেকে ধুলো নিতে, আবার পরের বার মহাপ্রভু চেষ্টা করছেন নিত্যানন্দ প্রভুর চরণ থেকে ধুলো নিতে। একে অপরকে আলিঙ্গন করছেন, পরম আনন্দে কীর্তন করছেন দীর্ঘ সময় ধরে। তারপর পূজার উপকরণ জোগাড় করা হয়েছে, মহাপ্রভু তখন বিশ্রাম করতে যাবেন। নিত্যানন্দ প্রভু তখন ব্রহ্মচারী দণ্ড ভেঙে, কমন্ডলু ভেঙে ফেলে দিয়েছিলেন। কেউ জানে না কেন এটা করলেন। চৈতন্যভাগবতে বলা হয়েছে অনেক কারণ হতে পারেÑআগে থেকে যদি কেউ মনে করে যে, সে রসিক আলোচনা করবেÑসেটা একটা বড় অপরাধ। তাই সেটা দেখানোর জন্য তাঁর দণ্ড ভঙ্গ করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন বর্ণাশ্রমের ঊর্ধ্বে, তিনি হচ্ছেন ভগবান স্বয়ং, তাই বিভিন্ন ধারণা রয়েছে।

পরের দিন সকাল বেলায় শ্রীবাস ঠাকুরের ভাই দেখলেন যে কমণ্ডলু সব ভাঙা। মহাপ্রভু তখন দণ্ডটাকে নিজে হাতে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় ফেলে দিয়ে এলেন। তারপরে ব্যাস পূজার সময়ে শ্রীবাস ঠাকুর নিত্যানন্দের হাতে দিলেন মালাটা। সেই মালাটা, ব্যাসদেবের যে উৎস তাঁর কাছে অর্পণ করলেন, যিনি হচ্ছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তখন মহাপ্রভু তাঁর ষড়ভুজ রূপ দর্শন করালেন। সেখানে দণ্ড, কমণ্ডলু, বাঁশরী ছিল, নিত্যানন্দের হল ছিল। নিত্যানন্দ যখন এই সব দেখলেন তিনি পরম আনন্দে মূর্চ্ছা গেলেন। মহাপ্রভু বলরাম-ভাব-এ ছিলেন এবং তিনি বলরামের অনুকরণ করছিলেনÑএ্যায় বারুণি দাও, মধু দাও। ছেলেরা ভক্তরা জানে না কি করবে, তখন এক পাত্র গঙ্গাজল নিয়ে এসে দিয়েছেন। তখন সেই মধু সবাইকে বিতরণ করলেন। সেই লীলা করে নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে এলেনÑতুমি যেন কোন অপরাধ নিও না আমার। মহাপ্রভুর থেকে সব কিছুর উৎস, বলরাম তাঁর অবতার, তাই তিনি বলরাম লীলা প্রকাশ করলেন। যখন ষড়ভুজ রূপ দর্শন করালেন মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু তখন মূর্চ্ছা গেছেনÑভক্তরা কেউ তাঁকে জাগাতে পারছেন না, চিন্তিত। কীর্তন শুরু করলে তিনি জেগে উঠলেন। এই সব ছিল তাঁর লীলা। গুরুদেব যে পূজা গ্রহণ করেন তা ব্যাসদেবের প্রতিনিধি হিসাবে। মোটের ওপর সমস্ত পূজাই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের জন্য। শেষে মহাপ্রভু বললেন- আজকের মতো ব্যাসপূজা সম্পূর্ণ হলো।

নিত্যানন্দ প্রভুর বিভিন্ন লীলা রয়েছে সেইগুলি আলোচনা করে অবশ্যই সকলে তাঁর কৃপা লাভ করতে পারেন এবং কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারেন। অবশ্য যারা বৈষ্ণব অপরাধ করে, সেটা মস্ত বড় বাধা। সেই সম্বন্ধে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যাতে এই জন্মেই আমরা কৃষ্ণের কাছে যেতে পারি গুরু গৌরাঙ্গের কৃপায়।

আসুন নিত্যানন্দ প্রভুকে সর্বত্র হৃদয়ে ধারন করি আর বলি…

ধন মোর নিত্যানন্দ, পতি মোর গৌরচন্দ্র, প্রাণ মোর যুগলকিশোর ।

অদ্বৈত আচার্য্য বল, গদাধর মোরকুল, নরহরি বিলসই মোর ॥১॥

বৈষ্ণবের পদধূলি, তহে মোর নানকেলি, তর্পণ মোর বৈষ্ণবের নাম ।

বিচার করিয়া মনে, ভক্তিরস আস্বাদনে, মধ্যস্থ শ্রীভাগবত-পুরাণ ॥॥২॥

বৈষ্ণবের উচ্ছিষ্ট, তাহে মোর মনোনিষ্ঠ, বৈষ্ণবের নামেতে উল্লাস ।

বৃন্দাবনে চবুতরা, তাহে মোর মনোঘেরা, কহে দীন নরোত্তম দাস ॥৩॥

সংগ্রহক:মুকুন্দমাধব দাসাধিকারী