ঢাকা, মে ২৪, ২০১৮, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, স্থানীয় সময়: ০২:৪৬:০৪

অস্থিরতা কমছে না ডলারের বাজারে

| ২৯ বৈশাখ ১৪২৫ | Saturday, May 12, 2018

ডলার

দেশে রফতানি আয় ও  রেমিটেন্স প্রবাহও বেড়েছে। তারপরও ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, টানা ১০ মাস ধরে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ডলারের বাজার। নির্বাচনের বছরে অর্থপাচার ও আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে ডলারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ব বাজারে ডলারের দামের পতন হলেও বাংলাদেশে দাম বাড়ছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া হলেও, এজন্য অর্থপাচারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।’

ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে এবং বাজারে ডলার ছেড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। ফলে হু হু করে বাড়ছে ডলারের দাম। ব্যাংকগুলো নগদ টাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে। এতে টাকার ওপর চাপ পড়ার পাশাপাশি আমদানি খরচও বেড়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১০ মে) ব্যাংকে ডলার সর্বোচ্চ ৮৬ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। আর কার্বমার্কেটে এর দাম আরও বেশি। গত এক বছরে ডলারের দাম বেড়ে ৪-৬ টাকা। গত বছরে ব্যাংকভেদে ডলারের দাম ছিল ৮২ টাকা।

পিআরআই’র নির্বাহী পরিচালকের মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ থেকে টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। আমদানি ও রফতানি দুইভাবেই দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে যত অর্থপাচার হচ্ছে তার বড় অংশ হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। আমদানি-রফতানিতে পণ্য ও সেবায় ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিং, আমদানি-রফতানিতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং, পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা থাকে। একইভাবে শিপমেন্টের ক্ষেত্রেও ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচার হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম ছিল ৭৯ টাকা ৭০ পয়সা। এখন ডলারের দাম ৮৩ টাকা ১০ পয়সায়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বলছে, অধিকাংশ ব্যাংকই ঘোষিত মূল্যের বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে। গত সপ্তাহের শেষ দুই কর্মদিবসে প্রায় সব ব্যাংকই ৮৬ টাকায় ডলার বিক্রি করেছে। আর খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) ৮৭ টাকার বেশি দামেও ডলার বিক্রি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনিশ্চয়তা দেখা দিলে অর্থপাচারের শঙ্কা বাড়ে। নির্বাচনের বছর স্বভাবতই অর্থপাচার বেশি হয়।’

তিনি বলেন, ‘গত বছরই পোশাক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে তুলা আমদানি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও উৎপাদনে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের খতিয়ে দেখা উচিত।’

এদিকে ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি করা পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাব মুক্ত নয় নিত্যপণ্যের বাজারও। ডলারের বাজারের অস্থিরতার কারণ খুঁজতে ও বাজার স্বাভাবিক করতে বাণিজ্যিক ব্যাংক অনুমোদিত ডিলার (এডি) ও মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে কয়েক দফায় বৈঠক করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এরপরও বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না। শুধু তাই নয়, বাজার স্থিতিশীল রাখতে গত বছরের জুলাই থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১০ মাসে (২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ৩ মে পর্যন্ত) বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। যদিও এই সময়ে রফতানি আয় বেড়েছে ৬.৪১ শতাংশ। আবার জুলাই-এপ্রিল সময়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে ১৭.৫১ শতাংশ। কিন্তু আমদানি ব্যয়ের চাপে ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমছে না।

এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাহিদা বাড়ার কারণে ডলারের দাম বাড়ছে। এখন প্রতিদিন প্রচুর এলসির দেনা পরিশোধ করতে হচ্ছে। তবে রফতানি ও রেমিটেন্স থেকে সে পরিমাণ আয় আসছে না। যে কারণে ব্যাংকগুলোয় ডলারের কিছুটা সংকট আছে।’

আমদানি ব্যয় লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় চাপের মুখে পড়েছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। বাজার স্বাভাবিক রাখতে ডলার বিক্রি করেই চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (১০ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে তিন হাজার ১৯২ কোটি (৩১ বিলিয়ন) ডলার ছিল।

প্রসঙ্গত, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) পণ্য আমদানিতে ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৫৬৭ কোটি ডলারের। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি ডলার বা ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকারও বেশি।

আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে চলতি হিসাবেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি)দেশের চলতি হিসাবে ৬৩১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যদিও ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চলতি হিসাবে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল।